Social Icons

শনিবার, ৫ এপ্রিল, ২০১৪

এক শিশি চোখের জল এবং ... - আনিসুল হক

আমি প্রতিমাসে এক শিশি চোখের জল কিনি
এর নাম রিফ্রেশ টিয়ার
মেডইন টেক্সাস ইউএসএ

আমার ডাক্তার এই ড্রপারটা সর্বদা পকেটে রাখতে বলেছেন
যখনই আমার কাঁদতে ইচ্ছা করে
আমি যেন সেটা ইউজ করতে পারি

সেদিন ওষুধের দোকানে গিয়ে
আমি এক শিশি রিফ্রেশ লাফটার চাইলাম

এই ওষুধের দোকানি আমার সব খবর রাখেন

আমার হার্টের খবর
আমার ব্লাড প্রেসারের খবর
এমনকি মাসে আমার কতগুলো নিরোধক লাগে
আমি চোখের জল কিনি তিনি জানেন
আমি মুখের হাসি কিনতে চাই শুনে তিনি হাসলেন

আমি তার মুখের হাসিটা কিনতে পারলাম না
ওটা বাজারজাত করার কথা যখন ভাবছি

তখনই দেখি ওটা পেটেন্ট করা হয়ে গেছে ...

জলহাওয়ার লেখা - জয় গোস্বামী

স্নেহসবুজ দিন
তোমার কাছে ঋণ

বৃষ্টিভেজা ভোর
মুখ দেখেছি তোর

মুখের পাশে আলো
ও মেয়ে তুই ভালো

আলোর পাশে আকাশ
আমার দিকে তাকা–

তাকাই যদি চোখ
একটি দীঘি হোক

যে-দীঘি জ্যো‌ৎস্নায়
হরিণ হয়ে যায়

হরিণদের কথা
জানুক নীরবতা–

নীরব কোথায় থাকে
জলের বাঁকে বাঁকে

জলের দোষ? — নাতো!
হাওয়ায় হাত পাতো!

হাওয়ার খেলা? সেকি!
মাটির থেকে দেখি!

মাটিরই গুণ? — হবে!
কাছে আসুক তবে!

কাছে কোথায়? — দূর!
নদী সমুদ্দুর

সমুদ্র তো নোনা
ছুঁয়েও দেখবো না

ছুঁতে পারিস নদী–
শুকিয়ে যায় যদি?

শুকিয়ে গেলে বালি
বালিতে জল ঢালি

সেই জলের ধারা
ভাসিয়ে নেবে পাড়া

পাড়ার পরে গ্রাম
বেড়াতে গেছিলাম

গ্রামের কাছে কাছে
নদীই শুইয়ে আছে

নদীর নিচে সোনা
ঝিকোয় বালুকণা

সোনা খুঁজতে এসে
ডুবে মরবি শেষে

বেশ, ডুবিয়ে দিক
ভেসে উঠবো ঠিক

ভেসে কোথায় যাবো?
নতুন ডানা পাবো

নামটি দেবো তার
সোনার ধান, আর

বলবোঃ শোন, এই
কষ্ট দিতে নেই

আছে নতুন হাওয়া
তোমার কাছে যাওয়া

আরো সহজ হবে
কত সহজ হবে

ভালোবাসবে তবে? বলো
কবে ভালোবাসবে?

আসমানী প্রেম - নির্মলেন্দু গুণ

নেই তবু যা আছের মতো দেখায়
আমরা তাকে আকাশ বলে ডাকি,
সেই আকাশে যাহারা নাম লেখায়
তাদের ভাগ্যে অনিবার্য ফাঁকি !

জেনেও ভালোবেসেছিলাম তারে ,
ধৈর্য ধরে বিরহ ভার স'বো ;
দিনের আলোয় দেখাবো নিষ্প্রভ
জ্বলবো বলে রাতের অন্ধকারে ।

আমায় তুমি যতোই ঠেলো দূরে
মহাকাশের নিয়ম কোথায় যাবে ?
আমি ফিরে আসবো ঘুরে ঘুরে
গ্রহ হলে উপগ্রহে পাবে !

মাটি হলে পাবে শস্য- বীজে
বাতাস হলে পাবে আমায় ঝড়ে !
মৃত্যু হলে বুঝবে আমি কি যে ,
ছিলেম তোমার সারাজীবন ধরে !

কথোপকথন -৪ - পুর্ণেন্দু পত্রী

- যে কোন একটা ফুলের নাম বল।
- দুঃখ ।
- যে কোন একটা নদীর নাম বল।
- বেদনা ।
- যে কোন একটা গাছের নাম বল।
- দীর্ঘশ্বাস ।
- যে কোন একটা নক্ষত্রের নাম বল।
- অশ্রু ।
- এবার আমি তোমার ভবিষ্যত বলে দিতে পারি ।
- বলো ।
- খুব সুখী হবে জীবনে ।
শ্বেত পাথরে পা ।
সোনার পালঙ্কে গা ।
এগুতে সাতমহল
পিছোতে সাতমহল ।
ঝর্ণার জলে স্নান
ফোয়ারার জলে কুলকুচি ।
তুমি বলবে, সাজবো ।
বাগানে মালিণীরা গাঁথবে মালা
ঘরে দাসিরা বাটবে চন্দন ।
তুমি বলবে, ঘুমবো ।
অমনি গাছে গাছে পাখোয়াজ তানপুরা,
অমনি জোৎস্নার ভিতরে এক লক্ষ নর্তকী ।
সুখের নাগর দোলায় এইভাবে অনেকদিন ।
তারপর
বুকের ডান পাঁজরে গর্ত খুঁড়ে খুঁড়ে
রক্তের রাঙ্গা মাটির পথে সুড়ঙ্গ কেটে কেটে
একটা সাপ
পায়ে বালুচরীর নকশা
নদীর বুকে ঝুঁকে-পড়া লাল গোধূলি তার চোখ
বিয়েবাড়ির ব্যাকুল নহবত তার হাসি,
দাঁতে মুক্তোর দানার মত বিষ,
পাকে পাকে জড়িয়ে ধরবে তোমাকে
যেন বটের শিকড়
মাটিকে ভেদ করে যার আলিঙ্গন ।
ধীরে ধীরে তোমার সমস্ত হাসির রঙ হলুদ
ধীরে ধীরে তোমার সমস্ত গয়নায় শ্যাওলা
ধীরে ধীরে তোমার মখমল বিছানা
ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টিতে, ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টিতে সাদা ।
- সেই সাপটা বুঝি তুমি ?
- না ।
- তবে ?
- স্মৃতি ।
বাসর ঘরে ঢুকার সময় যাকে ফেলে এসেছিলে
পোড়া ধুপের পাশে ।

বুধবার, ২ এপ্রিল, ২০১৪

মনে থাকবে? - আরণ্যক বসু

পরের জন্মে বয়স যখন ষোলোই সঠিক
আমরা তখন প্রেমে পড়বো
মনে থাকবে?
বুকের মধ্যে মস্ত বড় ছাদ থাকবে
শীতলপাটি বিছিয়ে দেব;
সন্ধে হলে বসবো দু'জন।
একটা দুটো খসবে তারা
হঠাৎ তোমার চোখের পাতায় তারার চোখের জল গড়াবে,
কান্ত কবির গান গাইবে
তখন আমি চুপটি ক'রে দু'চোখ ভ'রে থাকবো চেয়ে...
মনে থাকবে?
এই জন্মের দূরত্বটা পরের জন্মে চুকিয়ে দেব
এই জন্মের চুলের গন্ধ পরের জন্মে থাকে যেন
এই জন্মের মাতাল চাওয়া পরের জন্মে থাকে যেন
মনে থাকবে?
আমি হবো উড়নচন্ডি
এবং খানিক উস্কোখুস্কো
এই জন্মের পারিপাট্য সবার আগে ঘুচিয়ে দেব
তুমি কাঁদলে গভীর সুখে
এক নিমেষে সবটুকু জল শুষে নেব
মনে থাকবে?
পরের জন্মে কবি হবো
তোমায় নিয়ে হাজারখানেক গান বাঁধবো।
তোমার অমন ওষ্ঠ নিয়ে,
নাকছাবি আর নূপুর নিয়ে
গান বানিয়ে__
মেলায় মেলায় বাউল হয়ে ঘুরে বেড়াবো...
মনে থাকবে?
আর যা কিছু হই বা না হই
পরের জন্মে তিতাস হবো
দোল মঞ্চের আবীর হবো
শিউলিতলার দুর্বো হবো
শরৎকালের আকাশ দেখার__
অনন্তনীল সকাল হবো;
এসব কিছু হই বা না হই
তোমার প্রথম পুরুষ হবো
মনে থাকবে?
পরের জন্মে তুমিও হবে
নীল পাহাড়ের পাগলা-ঝোরা
গায়ের পোষাক ছুড়ে ফেলে
তৃপ্ত আমার অবগাহন।
সারা শরীর ভ'রে তোমার হীরকচূর্ণ ভালোবাসা।
তোমার জলধারা আমার অহংকারকে ছিনিয়ে নিল।
আমার অনেক কথা ছিল
এ জন্মে তা যায়না বলা
বুকে অনেক শব্দ ছিল__
সাজিয়ে গুছিয়ে তবুও ঠিক
কাব্য করে বলা গেল না!
এ জন্ম তো কেটেই গেল অসম্ভবের অসঙ্গতে
পরের জন্মে মানুষ হবো
তোমার ভালোবাসা পেলে
মানুষ হবোই মিলিয়ে নিও!